চেলা নদীতে ড্রেজার-বোমা মেশিন বন্ধের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন 

  সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা   বুধবার | জুলাই ১৪, ২০২১ | ১০:০৩ পিএম

সুনামগঞ্জের ছাতক-দোয়ারাবাজার উপজেলার চেলা ও মরা চেলা নদীর বালুমহালে ড্রেজার, বোমা ও শ্যালো মেশিন বন্ধের দাবি জানিয়েছে ছাতক বাজার একতা বালু উত্তোলন ও সরবরাহকারি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ি সমরায় সমিতি। পাশাপাশি সমিতির নেতারা বালু উত্তোলনে নিয়োজিত ১৫ হাজার শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়িদের জীবন-জীবিকা সচল রাখার দাবি জানিয়েছেন।

বুধবার (১৪ জুলাই) সিলেট জেলা প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সমিতির পক্ষে এ অভিযোগ ও দাবি করেন সমিতির সভাপতি বাবলু হোসেন শাহেদ।

লিখিত বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলা নিয়ে পাঁচশ ৬৬ একর জায়গার চেলা ও মরা চেলা নদীর বালুমহাল ১৪২৮ বাংলা সনের জন্য ইজারা দেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক।
ইজারা শর্তমতে, কোনো ড্রেজার মেশিন বা অন্য কোনো যন্ত্র ব্যবহার করে বালু এমনকি পাথর উত্তোলন করার কথা নয়। কিন্তু ইজারা গ্রহণের পর ইজারাদার গোপনে জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে ড্রেজার মেশিন ব্যবহারের অনুমতি নেন, যা নদী আইনের পরিপন্থী।

বেআইনিভাবে ড্রেজারের পাশাপাশি শ্যালো ও বোমা মেশিন দিয়ে বালুমহালের ৫০-৬০ ফুট নিচ থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ইজারা চুক্তির ৪ নম্বর শর্ত ভঙ্গ করে ইজারাদার অবৈধ বোমা ও শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করায় বারকি, বেলচা, বালু ও বালতি শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে মানবেতর দিনযাপন করছেন।

বক্তব্যে বলা হয়, অবৈধ ও নিয়মবহির্ভূত বালু উত্তোলনের কারণে নদী তীরবর্তী এলাকার দৌলতপুর গ্রামে একটি মসজিদ ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। পূর্বচাইরগাঁও, সোনাপুর, নাছিমপুর, শারপিননগর, রহিমের পাড়া, সোনাপুর, কাজিরগাঁওসহ ২০টি গ্রামের রাস্তা ঘরবাড়ি, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ৩ শতাধিক বাড়ি-ঘর নদীভাঙন ও হুমকির মুখে পড়েছে।


২০১৪ সাল থেকে নদীর বালুমহালের ইজারাদারসহ বিভিন্ন সংগঠন অতিরিক্ত রাজস্ব (রয়্যালিটি) আদায় ও শ্রমিকদের ওপর হামলা, অমানবিক নির্যাতন করে চলন্ত নৌ-পথের অন্তত ৩০টি স্থানে চাঁদাবাজি করত উল্লেখ করে সমিতির নেতারা জানান, গত কয়েক বছরে শ্রমিকরা এসব কারণে অতিষ্ট হয়ে ওঠেন। ঐক্যবদ্ধ হয়ে ‘ছাতক বাজার একতা বালু উত্তোলন ও সরবরাহকারি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ি সমবায় সমিতি (রেজিস্ট্রার নং-০৮১/সুনাম১৫) গঠন করা হয়। অত্যাচার ও অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ না হওয়ায় সমিতির পক্ষ থেকে হাইকোর্টে রিট পিটিশন মামলা (নং ১০৬১৭/২০১৭) করা হয়। এছাড়া অবৈধ বোমা, শ্যালো ও ড্রেজার মেশিন বন্ধের জন্য আরেকটি রিট পিটিশন মামলা (নং ১২৫৯৯/২০১৮) করা হয়।


বক্তব্যে বলা হয়, ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাবিরুল ইসলাম ছাতক উপজেলা পরিষদ মিলনয়াতনে সভা করে সুরমা ও চেলা নদীতে অবৈধ চাঁদা বন্ধে সরকারিভাবে রেজুলেশন করেন। পরবর্তীতে ইজারাদার ও পৌরসভার দুটি র্যায়েলটিসহ ৩টি স্থান বাদে সকল প্রকার অবৈধ চাঁদাবাজি বন্ধ করা হয়। কিন্তু আবার শুরু হয়েছে একই অবস্থা।

সুনামগঞ্জের বর্তমান জেলা প্রশাসক ১৪২৮ বাংলা সনে চেলা ও মরা চেলা নদীর বালুমহাল ইজারা দেওয়ার পর জামানতের টাকা ফেরতসহ অবৈধ ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু ও পাথর উত্তোলনের অনুমোদন দিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি করেন। ফলে ইজারাদার ড্রেজার মেশিনের সঙ্গে অবৈধভাবে বোমা ও শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু ও পাথর উত্তোলন শুরু করেন। 

বালুমহাল ইজারার একাধিক শর্ত লঙ্ঘন করার পরও কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেননি জেলা প্রশাসক। উল্টো তিনি অবৈধ বোমা ও শ্যালো মেশিনের ব্যাপারে রয়েছেন নিরব। ইজারাদারকে দিয়েছেন অবৈধ সুযোগ। অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নৌ পুলিশ গত ৪ জুলাই অভিযান করলে তাদের ওপর হামলা করা হয়।

বক্তব্যে জানানো হয়, ১৪২৬ বাংলা সনে চেলা ও মরা চেলা নদীর বালুমহাল ইজারা দেওয়ার পর বালু শ্রমিকের ওপর নির্যাতন ও অতিরিক্ত রয়্যালিটি আদায়ের কারণে তৎকালীন ইজারাদারের কাছ থেকে ২৫ শতাংশ জামানত রাখা হয়েছিল। 

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ১৪২৮ বাংলা সনে ইজারা দেওয়ার পর ইজারাদারের কাছ থেকে কোনো ধরনের জামানত রাখা হয়নি। এমনকি চেলা ও মরা চেলা নদীর বালুমহালটি সরকারের মহাল ব্যবস্থাপনা গেজেটের পরিশিষ্ট ‘ক’ (বিধি-১০(৬) এর বিধিমতে নদীর চর জাতীয় এলাকা থেকে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন করার কথা। এ বছর একইভাবে দরপত্র আহ্বান করে ইজারাও দেওয়া হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য জেলা প্রশাসক ‘খ’ জাতীয় বালুমহালের নীতিমালায় বালুমহাল সমঝে দেন ইজরাদারকে। পরিশিষ্ট ‘খ’ (বিধি-১০(৬) দ্রষ্টব্য) জাতীয় মহালে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলনের বিধান রয়েছে। জেলা প্রশাসক অবৈধভাবে বালুমহালের চিত্র ‘ক’ থেকে ‘খ’ শ্রেণিতে পরিবর্তন করে ইজারা প্রদান করেছেন। যার কারণে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী, ভূমিমন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের সচিবের হস্তক্ষেপ কামনা করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থার পথ সুগম করার দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, সমিতির সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান, সাবেক সভাপতি আব্দুস সাত্তার, সাবেক সাধারণ সম্পাদক দিলোয়ার হোসেন, বর্তমান কমিটির সহ-সভাপতি মুরাদ আলী, নির্বাহী সদস্য খালেছ মিয়া, মিজানুর রহমান চৌধুরী ও জহিরুল ইসলাম।