কথাবার্তায় সতর্কতা : ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ

  মোঃ আবদুল গনী শিব্বীর  সোমবার | জুন ২৮, ২০২১ | ১২:০০ এএম

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কেবলমাত্র মানবজাতিকে বাকশক্তি সম্পন্ন করে সৃষ্টি করেছেন। দেহাবয়বে মানবজাতি অন্যান্য মাখলুকাতের চাইতে যেমনিভাবে শ্রেষ্ঠ ঠিক তেমনিভাবে মেধা মনন, বাকশক্তি, সাবলীল ও প্রাঞ্জল কথা বার্তায়ও শ্রেষ্ঠ। মানুষ পরষ্পরের আলাপচারিতা, কথোপকথন, ব্যক্তিগত অধ্যয়ন, বক্তব্য ও বিবৃতি ইত্যাদি প্রকাশে কথাবার্তা বলতে হয়। প্রয়োজনীয় কথাবার্তায় মানুষের ব্যক্তিত্ব, রুচিবোধ, বংশীয় মর্যাদা, ব্যক্তির শ্রেণিগত অবস্থান প্রকাশ পায়। ইসলামে কথাবার্তার সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি রয়েছে। কটু কথা বলা, অশ্লীল বাক্যালাপ, অলিক কিংবা কাল্পনিক রোমাঞ্চকর কর্থাবার্তা, ধোকার মানসে কথা বলা, অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলা ইসলামে নিষেধ।  উত্তম কথাবর্তা ইসলামে সদকা হিসেবে বিবেচিত। ইসলামের প্রকৃত অনুসারীগণ কথাবার্তায় বেশ সতকর্তা অবলম্বন করেন। তারা একথা জানেন, প্রত্যেকটি কথার জন্য মহান রাব্বুল আলামীনের নিকট জবাবদেহী করতে হবে। তারা এও জানেন, উত্তম কথা ব্যক্তির আমলনামায় পূণ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। বিপরীতে অসংলগ্ন, অশ্লীল, অপ্রয়োজনীয় কথা ব্যক্তির আমলনামায় পাপ হিসেবে লিপিবদ্ধ হবে।
কথাবার্তায় সতর্কতা বিষয়ে পবিত্র কুরআনের বর্ণনাঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,‘তোমরা একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা (গীবত) করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভ্রাতার গোশত ভক্ষণ করতে চাইবে? বস্তুতঃ তোমরা তো এটাকে ঘৃণাই কর। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ তাওবা গ্রহণকারী, পরম দয়ালু। (সূরা হুজুরাত: আয়াত: ১২)। তিনি আরও বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, সেই বিষয়ে অনুমান দ্বারা পরিচালিত হয়ো না। নিশ্চয় কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় ওদের প্রত্যেকের নিকট কৈফিয়ত তলব করা হবে। (সূরা বনী ইসরাইল: আয়াত: ৩৬)। তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে (তা লিপিবদ্ধ করার জন্য) তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে। (সূরা ক্বাফ: আয়াত: ১৮)। আল্লাহপাক আরও বলেন, ‘ অবশ্যই তোমাদের ওপর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত আছে। সম্মানিত আমল লেখকবৃন্দ। তারা জানে যা তোমরা কর।’ (সুরা ইনফিতার: আয়াত: ১০-১২)। তিনি আরও বলেন, ‘ আর আমলনামা সামনে রাখা হবে। তাতে যা আছে; তার কারণে আপনি অপরাধীদেরকে ভীত - সন্ত্রস্ত দেখবেন। তারা বলবেঃ হায় আফসোস, এ কেমন আমলনামা। এ যে ছোট বড় কোন কিছুই বাদ দেয়নি - সবই এতে রয়েছে। তারা তাদের কৃতকর্মকে সামনে উপস্থিত পাবে। আপনার পালনকর্তা কারও প্রতি জুলুম করবেন না। (সুরা কাহাফ: আয়াত: ৪৯)। 
কথাবার্তায় সতর্কতা বিষয়ে হাদীস শরীফের বর্ণনাঃ প্রখ্যাত সাহাবি আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভাল কথা বলে; না হয় চুপ থাকে।’ (বুখারী ও মুসলিম)।

আবূ মুসা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল! সর্বোত্তম মুসলিম কে?’ তিনি বললেন, “যার জিহবা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।” (সহীহ মুসলিম: হাদিস: )।
সাহাল ইবনে সায়াদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী (অঙ্গ জিভ) এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী (অঙ্গ গুপ্তাঙ্গ) সম্বন্ধে নিশ্চয়তা দেবে, আমি তার জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব।” (সহীহ বুখারী: হাদীস: )। 
আবূ আব্দুর রহমান বিলাল ইবনে হারেস মুযানী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মানুষ আল্লাহ তা‘আলার সন্তোষমূলক এমন কথা বলে, আর সে কল্পনাও করে না যে, তা কোথায় গিয়ে পৌঁছবে, আল্লাহ তার দরুণ তাঁর সাক্ষাতের দিন পর্যন্ত তার জন্য সন্তুষ্টি লিখে দেন। পক্ষান্তরে মানুষ আল্লাহ তায়ালার অসন্তোষমূলক এমন কথা বলে, আর সে কল্পনাও করে না যে, তা কোথায় গিয়ে পৌঁছবে, আল্লাহ তার দরুণ তাঁর সাক্ষাতের দিন পর্যন্ত তার জন্য অসন্তুষ্টি লিখে দেন।’ (মুঅত্তা মালেক, তিরমিযী, হাসান সহীহ)। 
উক্ববাহ ইবনে আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নিবেদন করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল! কিসে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব?’ তিনি বললেন, “তুমি নিজ রসনাকে নিয়ন্ত্রণে রাখ। তোমার ঘর তোমার জন্য প্রশস্ত হোক। (অর্থাৎ অবসর সময়ে নিজ গৃহে অবস্থান কর।) আর নিজ পাপের জন্য ক্রন্দন কর।” (তিরমিযী)। 
আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আদম সন্তান যখন সকালে উপনীত হয়, তখন তার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জিভকে অত্যন্ত বিনীতভাবে নিবেদন করে যে, ‘তুমি আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। কারণ, আমাদের ব্যাপারসমূহ তোমার সাথেই সম্পৃক্ত। যদি তুমি সোজা সরল থাক, তাহলে আমরাও সোজা-সরল থাকব। আর যদি তুমি বক্রতা অবলম্বন কর, তাহলে আমরাও বেঁকে বসব।” (তিরমিযী)। 
আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, একদা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তোমরা কি জান, গীবত কাকে বলে?” লোকেরা বলল, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অধিক জানেন।’ তিনি বললেন, “তোমার ভাই যা অপছন্দ করে, তাই তার পশ্চাতে আলোচনা করা।” বলা হল, ‘আমি যা বলি, তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে, তাহলে আপনার রায় কি? (সেটাও কি গীবত হবে?)’ তিনি বললেন, “তুমি যা (সমালোচনা করে) বললে, তা যদি তার মধ্যে থাকে, তাহলেই তার গীবত করলে। আর তুমি যা (সমালোচনা করে) বললে, তা যদি তার মধ্যে না থাকে, তাহলে তাকে অপবাদ দিলে।” (মুসলিম) ।
একথা সকলের জানা উচিত, যে কথায় উপকার আছে বলে স্পষ্ট হয়, সে কথা ছাড়া অন্য সব (অসঙ্গত) কথা হতে নিজ জিহবাকে সংযত রাখা প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির উচিত। যেখানে কথা বলা ও চুপ থাকা দুটোই সমান, সেখানে চুপ থাকাটাই সুন্নত। কেননা, বৈধ কথাবার্তাও অনেক সময় হারাম অথবা মাকরূহ পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। অধিকাংশ এরূপই ঘটে থাকে। আর (বিপদ ও পাপ থেকে) নিরাপত্তার সমতুল্য কোন বস্তু নেই। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে চুপ থাকে সে মুক্তি পায়।”।  আরেকটি হাদীসে এসেছে ‘রাসুল (সা.) অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলতে নিষেধ করেছেন। (মিশকাতুল মাসাবীহ)।
পরিশেষে আল্লাহপাক আমাদেরকে কথাবার্তায় সতর্কতা অবলম্বনপূর্বক যাবতীয় কল্যাণ লাভের তাওফিক দান করুন। আমীন।

লেখকঃ মোঃ আবদুল গনী শিব্বীর, মুহাদ্দিস, নোয়াখালী কারামাতিয়া কামিল মাদরাসা, সোনাপুর, সদর, নোয়াখালী।