স্মৃতিতে মুক্তিযুদ্ধ 

  বৃহস্পতিবার | সেপ্টেম্বর ৯, ২০২১ | ০২:০২ এএম

ড.মাসুদুল কাদের
আমাদের জীবনে প্রতিটি ঘটনা যা আমাদের চোখের সামনে ঘটে এবং পরবর্তিতে এর ফলে আমাদের ব্যক্তি জীবন যেমন তেমনি সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি প্রভাবিত হয় ; এই সমস্ত ঘটনা ইতিহাসের অংশ হিসেবে হাজার বছর থেকে যায় । সমসাময়িক প্রত্যক্ষ দর্শিরা তাদের নিজ নিজ জীবন দর্শণ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ঘটনার বিশ্লেষণ করে । এমনকি হাজার বছর পরেও মানুষ তার জীবনবোধ বা মূল্যবোধের আলেকেই ইতিহাস বিশ্লেষন করে । যেমন সুলতান মাহমুদ গজনবী ১৭ বার ভারত আক্রমন করে আজ থেকে হাজার বছর আগে (৯৯৭-১০৩০ খৃষ্টাব্দ) । পকিস্থানের ইতিহাস বই যা আমাদেরকে ক্লাসে পড়তে হতো তা পড়ে আমাদের ধারনা হতো সে একজন মুসলিম বীর, এতে পাকিস্থানীদের মনে মুসলমান হিসেবে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি বোধ জন্ম নিতো । স্কুলে যখন উপরের ক্লাসে পড়ি তখন সামরিক শাসক  ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খাঁন সাহেব প্রায়স ফরমান জারি করে কিছু বই বাজেআপ্ত করতো, ঐ সমস্ত নিষিদ্ধ গ্রন্থ সংগ্রহ করে পড়ার ঝোক ছিল আমার। তার মধ্যে ছিল কামরুদ্দিন আহমদের পুর্বপাকিস্থানের সামাজিক ইতিহাস  (বইটি ইংরেজীতে লেখা); সত্যেন সেনের আল বেরুনী, এৎবধঃ জবষরমরড়হং ড়ভ ড়িৎষফ এবং এই ধরনের আরো অনেক বই । এই সমস্ত বই পড়ে একটা জিনিষ পরিস্কার হয়েছিল এই সমস্ত মুসলমান বাদশা সুলতানরা এই দেশে লুটপাট করার জন্য আসতো, কিন্তু ঐ সমস্ত লুটপাটকে ধর্মীয় ভাবে (গনিমতের মাল ) জায়েজ করার চেষ্টা করত। ঠিক একি ভাবে পাকিস্তানের সেনারা ১৯৭১ সালে এদেশীয় দোসরদের নিয়ে লুটপাট করেছে এবং এক শ্রেণির মোল্লা এই অপকর্মকে ন্যায় সঙ্গত হিসেবে ফতোয়া দিয়েছেন। আজ পর্যন্ত সেই শ্রেণীর মানুষ অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে মেনে নিতে পারেনি, ফলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় বিকৃতি রোধ করা যায় নাই । বিশেষ করে রাজনৈতিক ভাবে উদ্বুদ্ধ নয় এমন একটি সামরিক বেসামরিক আমলা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে পরবর্তীতে ক্ষমতা দখল করে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বিকৃতি ঘটিয়ে ছিলেন। 

মুসলিম শাসকরা যারা এদেশে থাকেনি তারা লুটপাটের সময়  এই দেশের শত শহস্র মানুষকে শুধু হত্যাই  করেতো না হাজার হাজার নারি, শিশু ও যুবককে ধরে নিয়ে যেত, তার দেশে দাস দাসি হিসেবে ব্যবহার করা জন্য । সুলতান মাহমুদ প্রতিবারই এই দেশ প্রচুর পরিমান অর্থ নম্পদ লুটে নিয়েছেন এবং হাজার হাজার এদেশীয় মানুষকে বন্দি করে নিয়ে গেছেন।  আবার কোন কোন মুসলিম শাসকরা এদেশে  শত বছর থেকে গেছে, কিন্তু এদেশকে শাসন কাজে  তার নিজ নিজ দেশ হতে মানুষ নিয়ে এসেছে, স্বল্প সংখ্যক দেশিয় অনুগত এলিট শ্রেণীর মানুষ (দেশিয় রাজা, জায়গিরদার, জমিদার) যারা রাজভাষা শিখতে পেরেছিলেন রাজদরবারে স্থান করে নিতে পেরেছে। 

এই ধারাবাহিকতায় দিল্লির দুর্বল শাসকের আমলে সুবে-বাংলার স্বাধীন নবাবী আমলের অবসান হয়, আমত্যদের  ষড়যন্ত্রের কারণে। প্রথমে বাংলায় এবং ধীরে সমগ্র ভারতে ইংরেজ শাসনের অধীনে চলে আসে। কথিত আছে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে যখন বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন পথের দুই পাশে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ দাঁড়িয়ে তামাশা দেখেছিল। অথচ ক্ষুদ্র একটি ইংরেজ সৈন্য দলকে পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ যদি একটা করে ঢিল ছুড়তো তবে ইংরেজ সৈন্যদল পালাতে বাধ্য হত। কিন্তু সিরাজ যদিও এই দেশের সাধারণ মানুষের জন্য লড়াই করেছেন কিন্তু সে লড়াইয়ের সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে পারেন নাই, যা সেই সামন্ত যুগে সম্ভবও ছিলনা। কিন্তু বাংলার ইতিহাসে প্রথমবারের মত শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে, বিদেশী শাসক ও তার অনুগত এদেশের আমলা মুৎসুদ্দি শ্রেণীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে পেরেছিলেন। তাই নয় মাসের যুদ্ধে, পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী হিংস্র সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনীকে মুক্তিযোদ্ধারা জনগণের সহায়তায় সহজে পরাজিত  করেছিল।

রাজদরবারের  আমির ওমরাহ, আমলা মুৎসুদ্দি মুসলমান শাসকদের আমলে ধর্ম বর্ণ  নির্বিশেষে ফারসি ভাষায় রাজকর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। ফলে শিল্প বাণিজ্য,  শিক্ষা জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা সব রাজ ভাষা ফারসির চর্চা হতো। ব্রিটিশ শাসন প্রচলিত ভাষায় রাজ কাজ চালালেও এক সময় ইংরেজি ও বাংলা ভাষার প্রচলন করে । স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ দ্রæত এই ভাষা রপ্ত করে ব্যবসা বাণিজ্য প্রশাসনের সর্বত্র নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করে নেয়।  ইতিহাস পাঠের মধ্যে থেকে একটি সত্যই স্পষ্টভাবে বেরিয়ে আসে, তা হল বাঙালি মুসলমানদের অধিকাংশেরই মধ্যে আরবি,ফার্সি, উর্দু ইত্যাদি ভাষার প্রতি একটা অন্ধ অনুরাগ অনেকদিন পর্যন্ত বিরাজমান ছিল, ফলে মুসলিম সম্প্রদায় ভাষা না শিখার কারণে পিছিয়ে পড়েছিল।

ভারত স্বাধীন করার প্রথম সংগ্রাম যাকে ব্রিটিশরা সিপাহি বিদ্রোহ বলে আখ্যায়িত করেছিল তাতে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করেছিল। ব্রিটিশ শাসকরা এই দুই সম্প্রদায়ের মানুষকে ভাগ করার জন্য প্রথমে আলিগড় কেন্দ্রিক তাদের অনুগত একটি মুসলিম কোটারি তৈরি করে ছিল এবং পরে ঢাকার অবাঙালি নবাবদের দিয়ে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম দিয়ে দ্বিজাতি তত্তে¡র ভিত মজবুত করতে বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে তার পূর্ণতা দিয়েছিল। ১৯০৫ সালে বাঙালি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বঙ্গভঙ্গ চায়নি; কিন্তু ১৯০৫-১১ সাল যখন ঢাকায় রাজধানী হয় তখন পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া নব্যশিক্ষিত মুসলমানগণ বিভিন্ন প্রকার সুযোগ সুবিধা পেয়ে খুশি হয়। এই পর্যায়ে কলতাকেন্দ্রীক অগ্রসর বাঙালি বঙ্গভঙ্গের ঘোরতর বিরোধিতা করে, দুঃখজনক সত্য ছিল অগ্রসর বাঙালির অধিকাংশ ছিল হিন্দু। অসাম্প্রদায়িক হিন্দু ও স্বল্প সংখ্যক মুসলিম ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করে ১৬ ডিসেম্বর ১৯১১ বঙ্গভঙ্গ রোধ করেছিল । সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাপকাঠিতে একটি ছিল বাঙালিত্ব আর একটা ছিল ধর্ম। এর মধ্যে দ্বিজাতিতত্তে¡র বীজ প্রোথিত হয়ে গেছিল।

১৯৩৫ সালে ‘'গভর্নমেন্ট ওব ইন্ডিয়া'’ আইন পাশ হয়, ঐ আইনের ফেডারেল অংশটি জিন্নার পছন্দের ছিল না। ১৯৩৯ সালে  জিন্নার নেতৃত্বে মুসলিম লীগের দাবি মেনে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফেডারেল অংশটি স্থগিত রাখেন। জিন্না ভেবেছিল পরে এই অংশ বাদ পড়ে যাবে, কিন্তু ১৯৪২ সালে লাহোরে মুসলিম লীগের সম্মেলনে পাকিস্তানের জন্য ফেডারেল পদ্ধতির প্রস্তাবনা উত্থাপন করেন একে ফজলুল হক, তার এই প্রস্তাব বাংলার বাঙালি মুসলিম নেতাদের সমর্থন পেয়েছিল। 

অন্যদিকে ১৯৪২ সালে "ভারত ছাড়ো" প্রস্তাব নিয়েছিল কংগ্রেস। কিন্তু বেশ কয়েক জন প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে জিন্না এর বিরোধিতা করেন। ঐ বছরই মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায়, বিশেষত জিন্নার দৃঢ় অবস্থানের ফলে মুসলিম লীগ ভারত ছাড়ো আন্দোলন থেকে দূরে থাকে। ঐ সময় সমগ্র ভারতের কংগ্রেস হাজার হাজার নেতাকর্মী গ্রেফতার হন। পক্ষান্তরে  ১৯৪২ থেকে ১৯৪৬ ব্রিটিশ সরকারের আনুকূল্য লিগের তুমুল বাড়বাড়ন্ত ঘটিয়েছিল। অন্যদিকে হিন্দু মুসলিম ঐক্য বিনষ্ট করতে এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়ে কংগ্রেসের অবস্থানের কারণে ব্রিটিশ আমলারা না খোশ ছিল। তাই তারা কংগ্রেসকে দুর্বল করতে এবং লিগকে বাংলা, আসাম এবং সিন্ধু প্রদেশে শক্তিশালী করার সর্বপ্রকার উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৯৪৩ সালে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে ফজলুল হক সাহেবের হিন্দু মুসলিম জোট সরকারের জায়গায় ইংরেজ অনুগত মুসলিম লীগের নাজিমুদ্দিন কে সরকার গঠন করতে বলেছিল, উদ্দশ্য মুসলিম লীগকে শক্তিশালী করা, হিন্দু মুসলিম ঐক্য বিনষ্ট করা। 

এইসময় ব্রিটিশরা নতুন এক তত্ব খারা করেছিল। নির্বাচন জিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার যে গনতান্ত্রিক রীতি সারা দুনিয়ায় চালু তা ভারতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। হিন্দু এবং মুসলিম জনগন  দুই বিচ্ছিন্ন সম্প্রদায় । এবং গনতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী দুই সম্প্রদায় কখনো এক হতে পারে না। অতএব, মুসলিম সম্প্রদায়ের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আছে। দ্বিজাতি তত্ত¡ কে এই ভাবে সাংবিধানিক ধড়াচূড়া পরিয়ে ছিলেন ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগো (১৯৪০)। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল ও তার সাম্রাজ্যবাদী বুদ্ধি থেকে দুই সম্প্রদায়ের ঐক্যের বিরোধী ছিলেন কারণ, তার বিচারে এক হলে " দু'দল মিলে আমাদের ঘাড় ধাক্কা দেবে"। আর তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে এ অবস্থায় ভারতকে কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না। এই কুটনৈতিক খেলায় শেষ রক্ষা না হলেও হিন্দু মুসলিম ঐক্য স্থায়ী ভাবে বিনষ্ট হয়ে ছিল । কংগ্রেস যখন ভারত ছাড় আন্দোলন শুরু করেছিল জিন্না তখন যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্রিটিশ রাজ বহাল থাকুক এই মতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
(তথ্য সূত্র: জিন্না ভারত দেশভাগ স্বাধীনতা- যশোবন্ত সিংহ)

১৯০৬ সালে বাংলা ভাগ করার পর মুসলমানদের নব্যশিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও নবাব জমিদার শ্রেণী যে সুযোগ সুবিধা পেয়েছিল তা ভুলতে পারেনি, তাই তারা দ্বিজাতি তত্ত¡ প্রচার করেছিল যা প্রবলভাবে মুসলমানদের গ্রাস করে ফেলেছিল। ফলে ১৯৪৭-এ শত চেষ্টা করেও বাংলা বিভাজন  রোধ করা যায়নি। মুসলিম লীগের অবাঙালি মুসলিম নেতৃত্বের সাথে চিন্তা চেতনার পার্থক্য ব্রিটিশ আমল থেকেই ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে থাকে,  অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শহীদ সহরোওয়ার্দী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ও মওলানা ভাসানীর মুসলিম প্রধান একটি স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার সকল প্রচেষ্টাকে জিন্না এবং লিয়াকত আলী ভÐুল করে দিয়েছিলেন । ফলে খÐিত বাংলা পূর্ব বাংলা হিসেবে পাকিস্তানের অংশে পরিণত হয়েছিলো । 

খÐিত বাংলা পূর্ব বাংলা নামে পাকিস্তানের অঙ্গীভূত হলেও, পরে এই নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে পাকিস্তানের অংশে পরিণত হলো। ১৯৫৫ সালে শেখ মুজিবুর পাকিস্তানের গণপরিষদের অধিবেশনে এই বিলের বিরোধিতা করেছিলেন। পাকিস্তানের শুরুতেই ভাষার প্রশ্নে এবং ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে  যুক্তফ্রন্ট  জয়ী হলে কেন্দ্রীয় শাসক চক্রের আচরণ এই ফ্রন্টের তরুণ নেতা শেখ মুজিব ও তরুণ রেডিক্যাল অংশকে বাংলা এবং বাঙালির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবিয়ে তুলেছিল।

বাঙালি যুদ্ধ করতে জানে না এই অপবাদ ঘোচাতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গঠিত বাঙালি পল্টনে হিন্দু-মুসলমান সকল বাঙালি যোগ দিয়ে প্রমাণ করে ছিল যুদ্ধ তারা করতে জানে। এর ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনার উন্মেষ আরো এক ধাপ এগিয়েছিল। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্যরা যে বীরত্ব প্রদর্শন করেছিল তাও মুসলিম বাঙালির মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল। বাঙালি মুসলমানের মনে এই বিশ্বাস প্রোথিত হয়েছিল যে আমরা প্রয়োজনে যুদ্ধ করতে পারি। কিন্তু এই চেতনার মধ্যেও ভারত ততা হিন্দু বিদ্বেষী দ্বিজাতিতত্তে¡র বীজ লুকাইত ছিল । যা স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসনের ভেতর দিয়ে পুনঃপ্রকাশিত হয়েছিল।
এই ভাবে বাঙালির মনে বাঙালি জাতীয়তা বোধের জন্ম নিয়েছিল। ব্রিটিশবিরোধী লড়াইটা শুরুতে ছিল হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের যুক্ত লড়াই, যার উল্লেখ পূর্বেই করেছি, কিন্তু কেন তা এক থাকলো না তাও সংখেপে আলোচনা করেছি। সেই সমস্ত ইতিহাস না জানলে মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্রটি বোঝা যাবে না। সে ইতিহাস নিজ উদ্যোগে পড়েছিলাম বলেই পাকিস্তানের অধীনতা মুক্ত করতে যুদ্ধে যেতে কোনো দ্বিধাদ্ব›দ্ব ছিল না। 

পাকিস্তান আমলে স্কুল-কলেজে শেখানো হতো বিকৃত ইতিহাস, যে ইতিহাস লুটেরা রাজরাজরা কাহিনীতে ভর্তি থাকতো। সেই সমস্ত লুটেরা শাসকদেরকে মহিমান্বিত করে তাদের   পাকিস্তানের মুসলমানের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে প্রচার করা হতো, দ্বিজাতিতত্তে¡র মতবাদ সুদৃঢ় করার জন্য। কিন্তু বাস্তবে মুসলিম সমাজে আশরাফ আতরাফ বিভাজন ছিল। দেশ শাসনে মুসলিম জমিদার ও ব্রিটিশদের সৃষ্টি এলিট শ্রেণী, যারা অধিকাংশ ছিল অবাঙালি ছিল, তাদের আধিপত্য ছিল। তারা বাঙালি মুসলমানদের নিম্ন শ্রেণীর মুসলিম হিসেবে দেশ শাসনের উপযুক্ত মনে করতো না, এমনকি বাংলা ভাষাকে হিন্দুর ভাষা মনে করা হতো।

রেডিও টেলিভিশন পাঠ্যপুস্তক সর্বত্র ছিল এক বিজাতীয় অপসংস্কৃতির চর্চা, মুক্তবুদ্ধির  চর্চা প্রায় অসম্ভব ছিল। শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলমান তারা বাঙালি জাতির অংশ না মুসলিম জাতির অংশ এই নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। তবে চাকুরী, ব্যবসা বাণিজ্য সকল ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া বাঙালি মুসলমান বিশেষ করে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যারা শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ছয়দফা তথা বৈষম্যের অবসান কামনা করে আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিল, তাদের মধ্যে দ্বিধাদ্ব›দ্ব কাজ করলেও শ্রেণী স্বার্থে ব্যপক ভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিল, কিন্তু দেশ স্বাধীন হলে তার তাদের দোদুল্যমান মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন এবং দেশকে আবার সাম্প্রদায়িক বিকৃত পাকিস্তানি ভাব ধারায় নিয়ে যেতে সচেষ্ট হয়ে মুজিব বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছিল।

 সেই সমস্ত ভুল ঐতিহাসিক ধ্যান ধারণা এখনো আমাদের দেশকে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত করে রেখেছে। তাই আমাদের দেশের একটি গোষ্ঠী সহজেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নাশ করার জন্য সক্রিয় রয়েছে। কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা কোনো দিন সফল হবে না, কারণ দেশের সাধারণ মানুষ প্রকৃত অর্থে মুক্তি চায়, সে মুক্তি মানে সর্বাগ্রে অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বা চিন্তার মুক্তি। 

এই গঙ্গেয় বদ্বীপের শিক্ষিত দোদুল্যমান মধ্যবিত্ত সুবিধাবাদি বাঙালি মুসলমানগণ কাঙালের ধন চুরি করে বিত্তশালী হতে চায়। তাই তারা বলে না পারলে অপকৌশলে জনতার পকেট খালি করে দেয়। স্বাধীন বাংলাদেশে অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে ব্ঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী সরকার ক্ষমতায় থাকলেও, দেশে ধর্মজ রাজনীতি যেমন তেমনি দুর্ণীতি প্রবল ভাবে বর্তমান। এখনো জনগণের একটি অংশ স্বাধীনতার সুফল অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ করেনি। তাই "মুক্তির সংগ্রাম" শেষ হয়ে যায় নাই, সাধারণ মানুষ তার জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে এই সমস্ত প্রতারকচক্রকে চিনতে পারবে এবং বুঝতে পেরে একদিন জয়ী হবেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের সেই আশাবাদ যোগায়। 

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল বাংলা ভাষার আন্দোলন। শাসকগোষ্ঠী যখন সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চায়েছিল, তখন তারা বুকের রক্ত দিয়ে তা প্রতিরোধ করেছিল। ছাত্রদের সাথে ১৯৫২ সালে ভাষা শহীদ বরকত ছিল একমাত্র ছাত্র আর সবাই ছিল সাধারণ মানুষ। সেই সমস্ত নিরক্ষর সাধারণ মানুষ "ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়" এই বলে প্রতিবাদ  করতে এগিয়ে এসেছিল।

লেখক : কৃষি গবেষক ও মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা কমান্ডার