রিমান্ড ও ন্যায় বিচার

  মো. মাহমুদুল হাসান মাসুম  সোমবার | আগস্ট ২৩, ২০২১ | ০১:১৭ এএম

ইংরেজি 'রিমান্ড' (Remand) শব্দটির অর্থ আসামিকে পুলিশি হেফাজতে পুনঃপ্রেরণ। বাংলায় রিমান্ড (REMAND) অর্থ ফেরত আনা। কিন্তু আইনি ভাষায় 'পুলিশ হেফাজতে আটক' রাখা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

একটি সভ্য সমাজের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত বিষয় ন্যায়বিচার। কেননা, ন্যায়বিচারবঞ্চিত সমাজের শান্তি, সভ্যতা ও প্রগতি এক কথায় মানবজীবনে কোনো উৎকর্ষতা থাকে না। তাই যেকোনো সভ্য সমাজের জন্য ন্যায়বিচার অপরিহার্য। আর এর জন্য প্রয়োজন আইনের শাসন। লর্ড চ্যাথাম বলেছেন, ‘আইন যেখানে শেষ, সেখানেই অত্যাচার শুরু।’

ন্যায়বিচার পাওয়ার পূর্বশর্ত যেমন ন্যায়পরায়ণ, সৎ ও দক্ষ বিচারক; তেমনি বিশেষ করে ফৌজদারি মামলায় সত্যিকার দোষী ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনার দায়িত্ব দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। একটি ফৌজদারি মামলায় যিনি তদন্তকারী কর্মকর্তা থাকেন, তাঁর সততা ও দক্ষতা দোষী ব্যক্তিকে উপযুক্ত সাক্ষ্য–প্রমাণ দ্বারা শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ ভূমিকা থাকে। 

পত্রিকার পাতা খুললেই বা টিভিতে দেখা যায় রিমানের নামে নারী আসামির সাথে পুলিশের অসৌজন্যমূলক অচরণের চিত্র, নারী বা পুরুষ আসামির সাথে রিমান্ডে নির্যাতন কোন ভাবেই কাম্য নয়, নারী আসামির সাথে তো নয়ই, নারী আসামিকে জিজ্ঞেসা করার সময় তদন্ত কর্মকর্তাকে অন্য নারী পুলিশকে সামনে রেখে জিজ্ঞেসা করার বিধান থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রেই মানা হয় না। এজাহারে উল্লেখিত বিষয়গুলো এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ/ উদঘাটন করাই হল রিমান্ডের উদ্দেশ্য। ‘রিমান্ড’ (Remand) শব্দটির সাথে আইনাঙ্ঘনের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও টেলিভিশনের দর্শক, খবরের কাগজ পড়ুয়া ব্যক্তিগণও পরিচিত। তবে এ পরিচয় হয়তো কেবল শুনার বা পড়ার মাধ্যমে। অনেকেই এই শব্দ শুনলেই আতকে উঠেন। পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার আর নির্যাতনই কী রিমান্ড? সে সম্পর্কে চলুন কিছু ধারণা নেয়া যাক।

একটি কথা প্রথমেই বলে রাখি, রিমান্ড আদালতের আদেশ ব্যতিত কোনোভাবেই সম্ভবপর নয়, ইচ্ছে করলেই পুলিশ কাউকে রিমান্ডে নিতে পারে না।

ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ১৬৭ ধারার আলোচনায় রিমান্ড বলতে বুঝানো হয়েছে, আসামিকে গ্রেফতারের পর পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটবর্তী আদালতে পুলিশ কর্তৃক তাকে সোপর্দ করা হয়। এ সময় তদন্তের স্বার্থে আনীত অভিযোগ বা জড়িত থাকার সত্যতার সত্য উদ্ঘাটনের জন্য যদি আরও প্রয়োজন হয় সেক্ষেত্রে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার নিমিত্তে পুলিশ কর্তৃক উক্ত আদালতে আবেদন করাকে বুঝায়। পুলিশ কর্তৃক ধৃত করার পরই নিকটবর্তী আদালতে সোপর্দ করে এই ধারায় রিমান্ড চাওয়া হয়। রিমান্ড মঞ্জুরের আদেশ প্রদানের ক্ষমতা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট ও দ্বিতীয় শ্রেণির বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটকে দেওয়া হয়েছে। উক্ত আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত একাধারে অনধিক ১৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করতে পারেন।
রিমান্ড আবেদনের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে থাকে-

মামলার ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনমূল আসামির নাম থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে এবং তার কাছ থেকে মূল আসামির নাম পরিচয় জানার চেষ্টা। ঘটনার উৎস জানা। জড়িত অপর আসামির তথ্য পাওয়া, আলামত থাকলে তা উদ্ধারের জন্যে খবর পাওয়া ঘটনার ক্লু উদঘাটনই রিমান্ড এর লক্ষ্য।

একটি মামলার রায়ে মাননীয় বিচারপতি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, উপরিউক্ত নির্দেশনাবলি যদি কোনো পুলিশ কর্মকর্তা অথবা বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট পালন করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তাঁরা আদালত অবমাননার দায়ে শাস্তিযোগ্য হইবেন এবং সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ওই ব্যাপারে মহামান্য হাইকোর্টে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য হাইকোর্ট বিভাগের শরণাপন্ন হতে পারবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, ওই নির্দেশনাসমূহ প্রায় ক্ষেত্রেই পালন করা হয় না; যা শুধু আইনের ব্যত্যয়ই নয়, উচ্চ আদালতের নির্দেশনার প্রতি অবজ্ঞার সমতুল্য, যাহা আদালত অবমাননারও শামিল।

রিমান্ডের নামে পুলিশের হেফাজতে কোনো আসামিকে যাতে অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ভোগ করতে না হয়, সে কারণে আমাদের উচ্চ আদালতের নির্দেশনাগুলো পালন করা উচিত। তদুপরি আসামিকে রিমান্ডে নেওয়ার আগে এবং তাঁকে যখন রিমান্ড থেকে আদালতে আনা হয়, উভয় ক্ষেত্রে তার ওপর কোনো শারীরিক নির্যাতন হয়েছে কি না, তার জন্য বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশনা দেওয়া একান্ত আবশ্যক। তাহলে দেখা যাবে, অনেক নিরীহ ব্যক্তি একদিকে যেমন পুলিশ কর্তৃক শারীরিক নির্যাতনের শিকার হবেন না, অপর দিকে পুলিশের শেখানো মতে মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হবেন না।

বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট যখন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন, তখন স্বচ্ছ ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, মিথ্যা স্বীকারোক্তি করার কারণে একজন নির্দোষ ব্যক্তির জীবনে নেমে আসতে পারে চরম দুর্ভোগ, এমনকি দীর্ঘ কারাবাস ও মৃত্যুদণ্ড। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে একজন বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের যে মানবিক ও আইনি দায়িত্ব রয়েছে, তা পালনে অবশ্যই সতর্কতার দাবি রাখে।

লেখক, এ্যাডভোকেট জজ কোর্ট ঢাকা।