ইসলামে কুরবানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব 

  মুফতি ডা. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান   সোমবার | জুলাই ১৯, ২০২১ | ০২:৫১ পিএম

পবিত্র ঈদ-উল-আযহা দরজায় কড়া নাড়ছে। মুসলিম রীতি অনুযায়ী প্রতি বছর এই ঈদে পশু কুরবানি করা হয় এবং গোশতের বড় একটি অংশ গরিব দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হয়। শাব্দিক অর্থে কুরবানি হচ্ছে নৈকট্য অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ত্যাগের মাধ্যমে নৈকট্য হাসিল করা। আর এ কাজটিই করেছিলেন আমাদের মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আঃ)। তার আদরের পুত্র হযরত ইসমাঈল(আঃ) যখন হাঁটতে শিখলো তখন স্বপ্নে আদিষ্ট হলেন তাকে জবেহ্ করার। স্বপ্নের কথা ইসমাঈলকে (আঃ) জানানো হলে তৎক্ষণাৎ তিনি রাজি হয়ে যান। ইব্রাহীম (আঃ) পুত্রকে নিয়ে জবেহ্ করার জন্য প্রস্তুতকালে মূহুর্তেই মহান আল্লাহ তায়ালা তার ত্যাগে খুশি হয়ে আকাশ থেকে একটি দুম্বা পাঠিয়ে দিলেন। পুত্র ইসমাঈল আঃ এর পরিবর্তে জবেহ্ হলো দুম্বা।

আমাদের মুসলমান সমাজে কুুরবানী নিয়ে আলোচনা হলে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাইল (আঃ) এর এই ঘটনাটি তুলে আনা হয়। অথচ কুরবানি করার রীতি তারও বহু আগে থেকেই হয়ে আসছে। হযরত আদম (আঃ) এর সময় কাল থেকে যুগযুগ ধরে (কুরবানি হিসেবে) পশু জবেহ্ করার প্রচলন ছিল। কিন্তু  তাদের জবেহ্ আর হাজার হাজার বছর পরে মুসলিম উম্মাহ যে পশু জবেহ্ করে তা এক নয়। প্রকৃতপক্ষে পূর্ববর্তী উম্মতদের জবেহ্ ছিল পরীক্ষা মাত্র আর আমাদের জবেহ্ হচ্ছে তাকওয়া। তাদের জবেহ্ কবুল হলে আকাশ থেকে অগ্নি পিন্ড এসে জ্বালিয়ে দিতো। অন্যদিকে কবুল না হলে স্বজাতির কাছে তিরস্কার পেতে হতে। এ দুটির একটিও এখন হয় না। শুধু তাই নয়, তৎকালে কুরবানির গোশত খাওয়াও যেত না! আর এসব নেয়ামত নূর নবী মুহাম্মদ আল আরাবি (সাঃ) এর ওছিলায় আল্লাহ আমাদের দান করেছেন।

আমরা যে জবেহ্ করি তার মূল ভিত্তি তাকওয়া। এজন্য জবেহ্ বা আদ্বহাকে কুরবানি বলা হয়ে থাকে। ঈদুল আজহাকে আমরা কুরবানির ঈদও বলি। ঈদের দিন অনেকগুলো পশু জবেহ্ হবে কিন্তু কুরবানি কবুল হবে কিনা সেটা নির্ভর করবে তাকওয়ার ওপর। সূরা হাজ্বের ৩৭নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন "অবশ্যই আল্লাহর নিকট এর গোশত ও রক্ত পৌঁছে না বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া"। কুরবানিদাতার দুটি যোগ্যতা জরুরি। প্রথমত এখলাছ অর্থাৎ শুধু আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি করা। মহান আল্লাহ্ তায়া’লা বলেন " বলুন আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মৃত্যু শুধুই আল্লাহ তায়ালার জন্য (সূরা আনআম-১৬২)। দ্বিতীয়ত মালে নিসাব অর্থাৎ সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে ৫২ তোলা রৌপ্য বা সমপরিমাণ নগদ অর্থ বা মালের মালিক থাকা। দুঃখের বিষয় হলো আজকাল কুরবানিদাতাদের অনেকের মধ্যেই এ দুটি যোগ্যতার একটিরও দেখা পাওয়া বিরল। ফলে কুরবানির মহান ত্যাগের মহিমা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সারা বছর ফ্রীজে মাংস রেখে খাওয়া ত্যাগ নয়, বরং এটি ভোগ বা বাজার খরচ বাচাঁনো। 

কুরবানির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যোগ্যতাসম্পন্ন পশু কুরবানি করা। এক্ষেত্রে পশুটি গৃহ পালিত চতুষ্পদ প্রাণীটি হালাল হতে হবে। বন্য গরু, হরিণ ও মোরগ ইত্যাদি শিকার করে কুরবানি দিলে হবে না। কুরবানির পশু সুস্থ সবল ও সুন্দর হওয়া উচিত। এক নজরেই যেন দৃষ্টি কেড়ে নেয় এরূপ হওয়া বাঞ্ছনীয় । আমরা পশু ক্রয় করার ক্ষেত্রে প্রায় সময় শুধু ওজন দেখি কিন্তু সৌন্দর্যের গুরুত্ব দিতে চাই না। এটা মোটেও ঠিক নয়। বলতে গেলে কুরবানির ক্ষেত্রে আমাদের সমাজের লোকজন সময়ের গুরুত্ব যতটুকু দেয় বিপরীতে নিয়মের তেমন গুরুত্ব দেয় না বললেই চলে। সুতরাং সুন্নাত অনুযায়ী পশু ক্রয় বিক্রয়, জবেহ করা ও গোশত বণ্টন করা ইত্যাদি কুরবানি কবুল হওয়ার জন্য অতি জরুরি বিষয়। এখানে একটি প্রাসঙ্গিক বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। সেটি হলো, কুরবানির কাজের সহযোগী যদি কোনো শ্রমিকের সাহায্য নেওয়া হয় তাহলে তাকে পারিশ্রমিক হিসেবে টাকা দিতে হবে।

যাইহোক, ইসলাম আমাদের পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা দেয়।অথচ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রায় প্রতিবছরই বিশৃঙ্খল অবস্থা লক্ষ যায়। বিশেষ করে শহরে এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। তাই জবেহ্ করার পর কুরবানির পশুর রক্ত, মল, উচ্ছিষ্ট তথা বর্জ্য মাটিতে গর্ত করে পুঁতে রাখা একান্ত অপরিহার্য। এভাবে বর্জ্য ফেলে রেখে পরিবেশ নষ্ট করে মানুষকে কষ্ট দেওয়া নিঃসন্দেহে কঠিন গুনাহের কাজ, যা ইসলামে পুরোপুরি নিষিদ্ধ। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন "যে মানুষেকে কষ্ট দেয় সে আমার উম্মত নয়"। যেহেতু রক্ত পঁচে দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং তাতে মানুষ কষ্ট পায় তাই এটা করা হারাম কাজ। অন্য বর্ণনায় তিনি (সাঃ)  বলেন "তোমরা তোমাদের বাড়ি ঘর ও আঙ্গিনা পরিষ্কার রাখ, ইহুদিদের মতো জমা করে রাখবে না। তিনি (সাঃ) আরও বলেন "পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক "। এভাবে সুন্নাহর আলোকে বর্জ্য ব্যবস্থা করা আমাদের নৈতিক ও ঈমানী দায়িত্ব। পাশাপাশি  প্রশাসনকেও দ্রুত বর্জ্য অপসারণে দৃষ্টি দেয়া আবশ্যক। আসুন আমার সচেতন হই ও সতর্ক থেকে মহামারি থেকে নিজেদের রক্ষা করি।আমাদের সকলের কুরবানি আল্লাহ তায়ালা কবুল করুন। আমীন।

লেখক: সাবেক সম্পাদক, সাপ্তাহিক ইসলামিক চিন্তাধারা