ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারা ও আসামির জবানবন্দি 

সাম্প্রতিককালে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নিয়ে বেশ বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে কিশোরী হত্যার কথা আসামিরা স্বীকার করার পর সেই কিশোরী ফিরে এসেছে। চট্টগ্রামে মৃত (!) দীলিপ ফিরেছে। সেখানেও ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে দীলিপকে হত্যার কথা স্বীকার করেছিল আসামিরা। শিশু হত্যার আসামি মাজেদার জবানবন্দিও উচ্চ আদালতে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। খালাস পান মৃত্যুদণ্ড থেকে। শেষ দুটো ঘটনা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রচার করে বিভিন্ন মিডিয়া। সাম্প্রতিক এই তিন ঘটনাতেই আসামিদের গুরুতর অভিযোগ, পুলিশের হত্যার হুমকি ও নির্যাতনের কারণেই তারা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য হয়েছেন।

১৬৪ ধারার জবানবন্দি হচ্ছে- একজন আসামির স্বেচ্ছায়, স্বপ্রণোদিত হয়ে ভুল বুঝতে পেরে স্বীকারোক্তিমূলক বয়ান, যেটা সে ক্ষেত্র বিশেষে করে থাকে। আমাদের দেশে দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণ করা হয় পুলিশ রিমান্ড শেষ করার পর। কেউ রিমান্ডে থাকেন ৫ দিন, কেউবা ৭ দিন। তাহলে পুলিশ রিমান্ডে কি এমন কিছু হয় যে কারণে রিমান্ড শেষে হওয়ার সাথে সাথেই আসামি অনুতপ্ত হয়ে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি প্রদান করে।

এ ব্যাপারে আমাদের হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত আছে এমন যে, যদি পুলিশ রিমান্ডে সামান্যতম নির্যাতনের অভিযোগও থাকে তাহলে এই ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে যা-ই বলা হোক না কেন এর পুরোটাই স্বাক্ষ্যে ও এভিডেন্সের বাইরে চলে যাবে। এভিড্যান্স বা স্বাক্ষ্য হিসেবে এর কোনো ভ্যালুই থাকবে না। তাহলে প্রশ্ন হলো- আমাদের যে চলমান ইনভেস্টিগেশন সিস্টেম, সেই সিস্টেম সব সময় শর্টকার্ট মেথড খুঁজে কেন? ১৬৪ ধারার জবানবন্দি তো বিচারের জন্য সবচেয়ে মুখ্য বিষয় নয়। বিচার বা তদন্ত যদি কেউ করতে চায় তাহলে তো চারপাশের যে সকল এভিড্যান্স আছে, আলামত আছে তা-ই যতেষ্ট। কারণ, কোনো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হলে তো সেই অস্ত্রের প্রমাণ থাকে, গুলি করলে গুলির প্রমাণ থাকে, আঘাতের চিহ্ন থাকে, মৃত দেহ থাকে, রক্ত থাকে, ডিএনএ থাকে, ক্রাইম সিন এন্ড প্লেস থাকে এসবের ওপর জোর দেয়া যায়। একজন ইনভেস্টিগেশন অফিসার যদি এসব জিনিসগুলো  সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে সংগ্রহ করতে পারেন এবং ডিএনএ টেস্ট ও সায়েন্টিফিক এভিডেন্স সংগ্রহ করা যায় তাহলে তো একজন ইনভেস্টিগেশন অফিসারকে ১৬৪ ধারার জবানবন্দির ওপর কোনভাবেই নির্ভরশীল হবার প্রয়োজন হয় না। সে কারণেই প্রশ্ন জাগে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি দিয়েই কেন একজন অভিযুক্তকে সাজা দিতে হবে? ১৬৪ ধারার জবানবন্দি ছাড়া বাকি যে সব এভিডেন্স আছে সেগুলোই তো অভিযুক্তকে সাজা দেয়ার জন্য যথেষ্ট।

১৬৪ ধারার জবানবন্দি নেয়ার পেছনে আসলে টার্গেট থাকে শর্টকার্টে ইনভেস্টিগেশন শেষ করা। বুঝলাম, একজন অভিযুক্তকে রিমান্ডে নেয়ার পর সে স্বীকারোক্তি দিল, ম্যাজিস্ট্রেট জবানবন্দি রেকর্ড করলেন। কিন্তু হাইকোর্টে যখন মামলাটি যায় তখন বলা হয়, আসামি তো নিজেই অপরাধ স্বীকার করেছে তখন আর কিছুই বলার থাকে না। বিশেষ করে অন্যান্য যে পারিপার্শ্বিক এভিড্যান্সগুলো আছে সেগুলো কিন্তু থাকে না। কারণ, অভিযুক্ত ব্যক্তির এক্ষেত্রে ব্লাডের স্যাম্পল কালেকশন করা হয় না, সংশ্লিষ্ট পিস্তল সংগ্রহ করা হয়নি, এমনকি যে পিস্তল থেকে গুলিটা বের হয়েছে তা যে ওই পিস্তলেরই গুলি সেটাও ব্যালেস্টিক পরীক্ষা করে নির্ধারণ করা যায় নি। অতএব এসব কিছু না করেই সরাসরি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নিয়ে যিনি বলেন অভিযুক্ত ব্যক্তি খুন করেছেন তখন মূলত জবানবন্দি গ্রহণকারী ব্যক্তিই অপরাধী হয়ে যান। কারণ ইনভেস্টিগেশনের চরম দুর্বলতা ও অযোগ্যতার ফল। একজন ইনভেস্টিগেশন অফিসার মূলত একজন দক্ষ লোক, একজন এডুকেটেড লোক, একজন প্রশিক্ষিত লোক। তার কাজ হবে টেকনিক্যাল ক্যাপাবিলিটি ব্যবহার করে তথ্য উদঘাটন, রহস্য উদঘাটন এবং ঘটনার রহস্য উন্মোচন করা। কেন তার বিরুদ্ধে আসামিকে হুমকি দিয়ে, জোর করে, নির্যাতন করে, হত্যার হুমকি দিয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি আদায়ের অভিযোগ উঠবে ? তাকে তো রাষ্ট্র ও জনগণের অনেক অর্থ ব্যয় করে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, এমনকি তারা যেনো ভালোভাবে ইনভেস্টিগেশন করতে পারে
সেকারণে অনেক ইনভেস্টিগেশন অফিসারকে বিদেশ থেকেও প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়ে আনা হয়। হ্যা, পদ্ধতি অবলম্বন করা অনেক কঠিন, অনেক কষ্টের, অনেক চিন্তার, অনেক বেশি দক্ষতার বিষয়। তাই বলে সেটি না করে আমরা শর্টকার্ট মেথডে কেনো যাচ্ছি। এভাবে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি রেকর্ড করার দিকে যাওয়া আসলে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়। পৃথিবীর উন্নত, সভ্য রাষ্ট্রের কোথাও ১৬৪ ধারার জবানবন্দি এ দেশীয় পদ্ধতিতে গ্রহণ করা হয় না। কোনো কোনো দেশে পুলিশই ১৬৪ ধারার জবানবন্দি গ্রহণ করে আবার কোথাও ম্যাজিস্ট্রেট গ্রহণ করেন। তবে সেই ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির আইনজীবী, প্রসিকিউটরের পক্ষের আইনজীবী, পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটও উপস্থিত থাকেন। সবার উপস্থিতিতেই জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়, এমনকি এটার অডিও ভিডিও রেকর্ডও থাকে। পরবর্তীতে কোর্ট যেন সেটা নিয়ে আসতে পারে।

তাই ন্যায় বিচার পাবার ক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষের যে ক্ষণিক সংশয় তৈরি হয় সেটার মূল কারণ হলো আমাদের অদক্ষতা, আমাদের অধৈর্য, গোজামিল দেয়ার প্রবনতা ও সঠিকভাবে
ইনভেস্টিগেশন না করে ১৬৪ ধারার জবানবন্দির ওপর নির্ভর করা। এটা কোনোভাবেই সঠিক পদ্ধতি নয়, আইনের স্পিরিটও এটি নয়। তা যদি ভবিষ্যতে চলমান থাকে তাহলে ন্যায় বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে। একজন আইন বিশ্লেষকের মতে, সেই ইনভেস্টিগেশন অফিসারকে আলাদাভাবে পুরস্কৃত করা উচিত যিনি কোনো প্রকার ১৬৪ ধারা ছাড়া মামলার তদন্ত শেষ করে অপরাধ প্রমাণ করতে পারেন। পাশাপাশি, ইনভেস্টিগেশন অফিসারের জন্য বিসিএস-এ আলাদা ক্যাডার চালু করার জন্য পরামর্শ দেন তিনি। সেখান থেকে গভীর অধ্যয়ন ও কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে চমৎকার সব ইনভেস্টিভেশন অফিসার বেরিয়ে আসবে। বিভিন্ন দেশের তদন্ত সংস্থার সাথে সমসাময়িক প্রযুক্তি ও তদন্ত প্রশিক্ষণের জন্য দ্বিপাক্ষিক চুক্তিও বাড়ানো উচিত। আমাদের দেশের আইনে তদন্ত সঠিকভাবে না করলে শাস্তির কোন ব্যবস্থা কোন আইনে নেই। তবে পুলিশের আইনে ডিপার্টমেন্টাল ব্যবস্থা গ্রহণের কিছু ধারা আছে। ডিপার্টমেন্টাল অ্যাকশন তারা নিতে পারে; গুরুদণ্ড, লঘুদণ্ড তারা দিতে পারে। তবে সে নজিরও কিন্তু খুবই কম। তাই বলবো, ১৬৪ ধারার জবানবন্দি গ্রহণটি যেনো জোর করে আদায় করা না হয়। সেই সাথে মামলা প্রমাণের ক্ষেত্রে আরও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত বলে আমি মনে করি।

লেখক : এ্যাডভোকেট, জজ কোর্ট, ঢাকা