"এনার্জি পলিটিক্সের' জায়গায় রুশ-চীনা দ্বন্দ্ব এখনও আছে"

অধ্যাপক ড. এটিএম শামছুজ্জোহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। চীনে পিএইচডি করার সুবাধে দীর্ঘদিন তিনি সেখানে অবস্থান করেছিলেন। ড.জোহার পিএইচডি ছিলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর। চলমান ইউক্রেন সংকট ও বিশ্ব রাজনীতিতে চীনের ভূমিকা নিয়ে তিনি দৈনিক জাগো প্রতিদিনের সাথে কথা বলেছেন। ড.জোহার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মো. জামিন মিয়া।

দৈনিক জাগো প্রতিদিন :আপনি রুশ ইউক্রেন যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ করে থাকবেন। ইউক্রেন ইস্যুতে চীনের রহস্যজনক আচরণ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে। আপনি চীনের এই অবস্থানকে কিভাবে দেখছেন? 

ড. জোহা: চীন বর্তমান বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে একটি। চীনে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পিএইচডি করার সময় আমি দেশটির "বিগ পাওয়ার পলিসি" সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানকার অধ্যাপকদের সাথে কাজ করে আমি যেটা বুঝতে পেরেছি সেটা হচ্ছে, মাও জে দং থেকে শুরু করে বর্তমান শি চিনপিং পর্যন্ত তাদের নীতি হলো চীনা অর্থনীতিকে ধরে রাখা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে "হার্ড-পাওয়ার " ও "সফট-পাওয়ার" এর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। বর্তমানে রাশিয়ার সাথে তাদের যে সম্পর্ক, সেটা কৌশলগত। সেটি যে খুব ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তা বলা যায় না। দেখুন, চীন কৃষি নির্ভর একটি দেশ। অন্যদিকে রাশিয়ার চাষযোগ্য জমি খুব একটা নেই। কিন্তু তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ আছে। এসব সম্পদ চীনের দরকার আছে। তাই চীন সরাসরি কোনো পক্ষ নেবে না। যদিও চীনের নিরবতা ইউক্রেনের বিপক্ষে যাচ্ছে। 

দৈনিক জাগো প্রতিদিন: বিশ্লেষকরা মনে করেন, চীন রাশিয়া সম্পর্ক দিন দিন গাঢ় হচ্ছে। প্রবাদে আছে, শত্রুর শত্রু  বন্ধু । মার্কিন-চীন দ্বন্দ্বের কথা চিন্তা করলে, তা কতটুকু যৌক্তিক? 

ড. জোহা: মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে তেল-গ্যাস নিয়ে রুশ ও চীনের বড় ধরনের প্রতিযোগিতা আছে। পরিস্থিতি কখনো কখনো দ্বন্দ্বের দিকেও যাচ্ছে। আপনারা জানেন, চীন সিল্ক রোড প্রসারিত করছে। রাশিয়া কিন্তু সেখানে সরাসরি চীনকে সমর্থন করছে না। তার মানে 'এনার্জি পলিটিক্সের' জায়গায় রুশ-চীনা দ্বন্দ্ব এখনও আছে। 

দৈনিক জাগো প্রতিদিন: রাশিয়ার লক্ষ্য হলো ন্যাটো থেকে ইউক্রেনকে দূরে রাখা। আবার চীন এ সুযোগে আমেরিকাকে বহির্বিশ্বে খাটো করার চেষ্টা করছে।

ড. জোহা: আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটি বড় ধরনের কোন ব্যত্যয় নয়। চীন এই সুযোগ নেবে এটাই তো স্বাভাবিক। দেখুন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পশ্চিমা মিডিয়াগুলো দ্বিমুখী আচরণ করছে। লক্ষ্য করলে দেখবেন, ইউক্রেন ইস্যুতে তাদের সংবাদ এক ধরনের, আবার ফিলিস্তিন ও সিরিয়া নিয়ে অন্য ধরনের। সুতরাং আমেরিকা যেভাবে ঐসব ইস্যুতে সুযোগ নিচ্ছে, চীনও ইউক্রেন ইস্যুতে ঠিক সেভাবেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। 

দৈনিক জাগো প্রতিদিন: আপনি পাশ্চাত্যের  মিডিয়ার দ্বিমুখীতার কথা বললেন। সম্প্রতি রুশ রাষ্ট্রদূত আমাদের মিডিয়াগুলো পাশ্চাত্যের মতো ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ করেছেন।

ড. জোহা: ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, পাকিস্তানি পত্রিকাগুলো আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা করেছিল। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের দুষ্কৃতিকারী বা বিদ্রোহী বলে আখ্যায়িত করেছিল। এক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের কিছু মিডিয়াও  পাকিস্তানের মিডিয়ারগুলোর ভূমিকা রেখেছিলো। বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো পাশ্চাত্যের মিডিয়া প্রভাবের দ্বারা অনেকটা প্রভাবিত। বিষয়টি আমাদের অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। 

দৈনিক জাগো প্রতিদিন: রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার কয়েক সপ্তাহ আগে চীনের সাথে গ্যাস সম্পর্কিত ৩০ বছরের একটি চুক্তি করে। রাশিয়া জার্মানির সাথে গ্যাস পাইপলাইন স্থাপন করছে। যুদ্ধ শুরু হলে তা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, এটি রাশিয়া জানতো। তার মানে, এটি একটি পরিকল্পিত যুদ্ধ! 

ড. জোহা: ইউরোপের বড় বড় দেশগুলো রাশিয়ার গ্যাসের ওপর প্রায় ৪০% নির্ভরশীল। বোঝাই যাচ্ছে, রাশিয়ায় গ্যাসের বিশাল মজুদ রয়েছে। রাশিয়া চাইবে তার গ্যাসের ক্রেতা বাড়ুক, সে লক্ষ্যে ক্রেমলিন কাজ করছে। এটা পরিকল্পিত আক্রমণ হতেই পারে। রাশিয়া তার কৌশলগত জায়গা থেকে সেটি করেছে। এক্ষেত্রে চীনের সাথে গ্যাস চুক্তির সম্পর্ক একসূত্রে গাঁথা ঠিক হবে না।

দৈনিক জাগো প্রতিদিন: দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে এ অঞ্চলে 'ঋণের ফাঁদে" ফেলার তত্ত্বটি বেশ আলোচিত। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, বাংলাদেশ চীনের ফাদেঁ পড়বে না। আপনি কি তাই মনে করেন?

 ড. জোহা: আপনি যদি বিগত ২০ বছরের ডাটা বিশ্লেষণ করেন তাহলে দেখবেন, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ভারতের সাথে বাংলাদেশের লেনদেন কমেছে বিপরীতে চীনের সাথে বেড়েছে।আপনি জেনে থাকবেন, অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রোজেনেকার টীকার জন্য ভারতের সাথে আমাদের চুক্তি হয়েছিলো। কিন্তু ভারত তা দিতে ব্যর্থ হয়। পরে চীন সে সুযোগটি গ্রহণ করেছে।আঞ্চলিক বাজারের দিকে দেখুন। চীন যে দামে ভোক্তাদের পণ্য দিতে পারছে, ভারত তা পারছে না। স্থানীয় বাজারের যোগান ঠিক রাখতে হলে আমাদের চীন মুখী হতেই হবে। সুতরাং আঞ্চলিক রাজনীতির দিকে দৃষ্টি রেখে বলতে পারি, আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন। ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী। দেশটির সাথে কৌশলগত কারণে আমাদের সুসম্পর্ক বজায় রাখা দরকার। তবে সেটা চীনকে অসন্তুুষ্ট করে নয়।

দৈনিক জাগো প্রতিদিন: বাংলাদেশ সর্বশেষ অবস্থান অনুযায়ী, তারা ইউক্রেনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। 

 ড. জোহা: দেখুন, আগের ভোটাভুটি ছিলো একটি পক্ষকে দায়ী করা, যুদ্ধ বন্ধের জন্য নয়। তাই আমরা বিরত ছিলাম। এখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে ইউক্রেনের মানবিক সংকট দূর করার জন্য এই ভোটাভুটি হয়েছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশ এখানে "ম্যাচিউরড সিদ্ধান্ত" নিয়েছে। 

দৈনিক জাগো প্রতিদিন: পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোতে খবর বেরিয়েছে, রাশিয়া-চীনের কাছে অস্ত্র সহায়তা চেয়েছে। এটি যদি সত্য ধরে নিই তাহলে চীন কি রাশিয়াকে সহায়তা করবে?

ড. জোহা: দেখুন, একটি হচ্ছে সহায়তা এবং অন্যটি হচ্ছে বাণিজ্যিক লেনদেন। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, নেপোলিয়ন মহাদেশীয় ব্যবস্থা কোথায় চালু করেছিলেন গ্রেট ব্রিটেনকে চাপে রাখতে। কিন্তু তিনি নিজে গোপনে অন্যদের মাধ্যমে ইংল্যান্ড থেকে তার সেনাবাহিনীর জন্য জুতা সংগ্রহ করেছিলেন। এটা হলো বাণিজ্যিক পলিসি। অন্যদিকে মহাদেশীয় ব্যবস্থা হলো একটা পলিসি। ১৯৫৩ সালের পর চীন প্রত্যক্ষ কোন যুদ্ধে অংশ নেয়নি। এক্ষেত্রে আমরা উদাহরণ স্বরূপ আশির দশকের ভিয়েতনাম যুদ্ধের কথা উল্লেখ করতে পারি। চীন অর্থের বিনিময়ে অস্ত্র দিতেই পারে। তবে সেটা সহায়তা হিসেবে দেবে আমি তা মনে করি না। আর চীন যদি অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে তাহলে তারা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়বে।

দৈনিক জাগো প্রতিদিন: আপনাকে ধন্যবাদ। 
ড. জোহা: আপনাকেও ধন্যবাদ