৫০ বছরের ভাঙন এলাকা এখন পর্যটন কেন্দ্র: উদ্ধোধনের অপেক্ষায় জয়বাংলা অ্যাভিনিউ 

 দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছরের পদ্মার ভাঙন কবলিত শরীয়তপুরের নড়িয়া এখন পর্যটন কেন্দ্রে রূপ নিয়েছে। এই তো ২০১৮ সালেও সাড়ে ৬ হাজার ঘরবাড়ি, মসজিদ, মাদরাসা নদীগর্ভে চলে গেছে। পদ্মার ভয়াল গ্রাসে রক্ষা পায়নি ভাঙনের হাত থেকে পাকা বাড়ি, দোকানপাট, স্বাস্থ্য ক্লিনিক, মা-বাবাসহ আত্মীয়স্বজনের কবর কোনো কিছুই। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বদৌলতে ও পানি সম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীমের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গত দুই বছরে একটি বাড়িও ভাঙেনি। ৫০ বছরের ভাঙনকবলিত এলাকা এখন পরিণত হয়েছে নিরাপদ বসবাসের স্থানে। গড়ে উঠেছে নতুন নতুন অট্টালিকা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। নড়িয়ার পদ্মাপাড় পরিণত হয়েছে পর্যটন কেন্দ্রে। আর আগামী ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে নড়িয়ার বেড়িবাঁধের পাশে সুরেশ্বর থেকে মোক্তারেরচর পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে “জয় বাংলা অ্যাভিনিউ” এর উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। জয় বাংলা অ্যাভিনিউয়ে রাতের বেলায় আলোয় ঝলমল করবে ষ্ট্রিট লাইটের এলইডি বাতিতে। এযেন এক নতুন অভিযাত্রা। অতশবাতি জ্বালিয়ে ঝাঁকজমকপূর্ণভাবে উদ্বোধন করবেন। পানি সম্পদ উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীম এমপি এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন। বৃহস্পতিবার (২৪ মার্চ) সরেজমিন নড়িয়ার নদীভাঙন এলাকা বাঁশতলা, মুলফৎগঞ্জ, কেদারপুর, চন্ডীপুর, সুরেশ্বর এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষা এলেই পদ্মা পাড়ের মানুষের মনে জাগত ভাঙনের আতঙ্ক, আর্তনাদ ও হাহাকার। একসময়কার কোটি টাকার মালিক নদীভাঙনে হয়েছের নিঃস্ব। এমন পরিবার আছে শত শত। বর্ষা এলেই এ এলাকার মানুষ ভাঙন আতঙ্কে পরিবার নিয়ে ঘরবাড়ি সরিয়ে অন্যত্র অশ্রয় নিত। প্রমত্তা পদ্মার ভাঙা-গড়ার সঙ্গে দিন-রাত লড়াই করে যারা কোনোরকমে বেঁচে থাকার চিন্তা করতেন, সে জায়গায় ভাঙন রোধ হয়ে এখন পরিণত হয়েছে ভ্রমণপিপাসুদের পর্যটন কেন্দ্রে। স্থানীয়রা জানান, শুধু ২০১৮ সালেই এসব এলাকায় সাড়ে ৬ হাজার পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়। নদীগর্ভে বিলীন হয় পাকা ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, হাট-বাজার, গাছপালা, ফসলি জমি, মসজিদ-মন্দির, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান। সেই জায়গায় এখন ভাঙন রোধ হয়ে গড়ে উঠেছে মানুষের নিরাপদ আবাসস্থল। আর পদ্মা নদীর ডান তীর রক্ষা বাঁধ যেন এখন পর্যটন নগরী। প্রতিদিনই শত শত লোক নদীর পাড়ে ঘুরতে আসছেন।
সংশ্লিষ্টসূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীমের উদ্যোগে নড়িয়া-জাজিরার পদ্মা নদীর ডান তীর রক্ষা প্রকল্প নামে ১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি মেগা প্রকল্পের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। এ প্রকল্পের কাজ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। আর আগামী ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে নড়িয়ার বেড়িবাঁধের পাশে সুরেশ্বর থেকে মোক্তারেরচর পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে “জয় বাংলা অ্যাভিনিউ” এর উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। জয় বাংলা অ্যাভিনিউয়ে রাতের বেলায় আলোয় ঝলমল করবে ষ্ট্রিট লাইটের এলইডি বাতিতে। প্রায় ১ হাজার ৪শ৭০ কোটি টাকায় ব্যয়ে নির্মিতব্য এই পদ্মার ডানতীর রক্ষা বাঁধ থেকে নদীতে ওঠানামা করার জন্য মাঝে মাঝেই রয়েছে সিঁড়ি। নারীদের গোসল করে কাপড় পাল্টানোর জন্য রয়েছে আধুনিক ওয়াসরুম। কেদারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইমাম হোসেন দেওয়ান বলেন, দেওয়ান বংশ। এই এলাকায় সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহ্যবাহী বংশ। একসময় বাপ-দাদার বিশাল সহায়-সম্পত্তি ছিল। নদীগর্ভে সবই এখন বিলীনপ্রায়। একসময় অনেক কিছুই ছিল। বলতে গেলে এখন আমরা নিঃস্ব। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র কারণে এবং স্থানীয় এমপি ও পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীমের কল্যাণেই এখানকার মানুষ নদীভাঙন থেকে রক্ষা পেয়েছে। এনামুল হক শামীম ২০১৮ সালের আগে এমপি-মন্ত্রী না হয়েও ৫০ বছরের নদীভাঙন কবলিত এলাকাকে রক্ষার করার জন্য বারবার প্রধানমন্ত্রীর কাছে ছুটে গিয়েছিলেন বলেই আমাদের আজ আর নদী ভাঙে না। আমরা এখন নিরাপদে বসবাস করতে পারছি। এনামুল হক শামীম যদি আরও আগে এমপি-মন্ত্রী হতো তাহলে আর আমরা নদীভাঙনের ভাঙনের শিকার হতাম না। কেদারপুর গ্রামের গৃহিণী আসমা আক্তার, দোকানদার বাশার, মফিজ বলেন, নদীভাঙনে দেশের মানচিত্র থেকে আমাদের এলাকা হারিয়ে যাচ্ছিল। ২০১৮ সালেই কেদারপুরে প্রায সাড়ে তিন হাজার ঘরবাড়ি নদীতে চলে গেছে। সেই সময় আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম। তার মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত বেগম আশ্রাফুন্নেছা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রতিটি বাড়িতে প্রয়োজনীয় খাদ্য, বস্ত্রসহ সব ধরনের সহযোগিতা করেছেন তিনি। এমপি ও উপমন্ত্রী হওয়ার পর নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। এখন আর কোনো মানুষকে নদীভাঙনে চোখের পানি ফেলতে দেখা যায় না।
পদ্মার ভাঙন প্রতিরোধ কমিটির আহবায়ক ও নড়িয়া পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ বলেন, বর্ষা এলেই এখানে মানুষের যে আর্তনাদ, যে আতঙ্ক ছিল, সে বিষয়গুলো এখন আর নেই। লোকগুলো বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাঙনকবলিত এলাকার সেই আশ্রয়হীনদের গৃহায়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে আশ্রয় দিয়েছেন। নড়িয়ার পদ্মাপাড় এখন পর্যটন কেন্দ্র। পানি উন্নয়ন বোর্ডের শরীয়তপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম আহসান হাবীব বলেন, প্রকল্পের ৯০ ভাগ কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। আগামী জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। এর ফলে নড়িয়া-জাজিরার মানুষ নদীভাঙন থেকে স্থায়ীভাবে রক্ষা পাবেন বলে আশা করছি। বর্ষাকালে ভাঙন যেখানে নিত্যসঙ্গী সেখানে এখন পর্যটন কেন্দ্র। শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম বলেন, আমি নিজেও নদীভাঙন এলাকার মানুষ। নদীভাঙনের শিকার মানুষের কষ্টটা আমি বুঝি। দীর্ঘ ৫০ বছরের ভাঙন রোধ করা সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কারণেই। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এলাকার মানুষকে নদীভাঙন থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। আমি নড়িয়া-সখিপুর তথা শরীয়তপুরবাসীর পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। তিনি বলেন, শুধু আমার নির্বাচনী এলাকাই নয়, শরীয়তপুর জেলাসহ সারা দেশেই নদীভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। নদীর বুকে যেন আর কোনো ঘরবাড়ি বিলীন না হয়, আমরা সে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি।