ভূরাজনীতির জটিল সমীকরণে আফগানিস্তান 

সন্ত্রাসবাদ দমনের কথা বলে প্রায় দু দশক আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে অভিযান শুরু করেছিলো। এই দীর্ঘ যুদ্ধের পর এখন আফগানিস্তান ত্যাগ করছে মার্কিন সেনারা।মূলত যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ঘোষণা পর মার্কিন সেনারা আফগানিস্তান ছাড়তে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে তারা আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় ঘাটিঁ ছেড়ে চলে গেছে। মার্কিন সৈন্যরা আফগানিস্তান ছেড়ে চলে গেলে এর পরিবর্তী অবস্থা কেমন হবে তা নিয়ে চলছে নানা রকম বিশ্লেষণ। জো বাইডেনের  ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১১ সেপ্টেম্বর মধ্যে দেশটিতে কোন বিদেশি সেনা, বিশেষ করে মার্কিন সেনা থাকবে না। কার্যত এটি ওয়াশিংটনের পরাজয়েরই নামান্তর। এদিকে হোয়াইট হাউজের পরবর্তী ঘোষণা অনুযায়ী আফগানিস্তান থেকে আগামী আগস্টের মধ্যেই সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হবে। ২০০১ সালের ৯/১১ এর পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাৎক্ষণিকভাবে সন্ত্রাস দমনের অজুহাতে আফগানিস্তানে আক্রমণ করেছিলো। পরে মার্কিনিদের সাথে ন্যাটো সেনারাও যোগদান করেন। আর এই যুদ্ধ চলে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে। দীর্ঘ এই যুদ্ধে জর্জ ডব্লিউ বুশ থেকে শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের  সবচেয়ে সমালোচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পর্যন্ত তা চলেছিল। সুতরাং আফগানিস্তানকে যুদ্ধ ক্ষেত্রের মাঠ বললে ভুল হবে না। সংগত কারণেই আফগানিস্তানে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার আগ্রাসনের আলোচনার পূর্বে সোভিয়েত দখলদারিত্বের ঘটনাটিও তুলে ধরা প্রয়োজন। রাশিয়ার সাথে আফগানদের বহু আগে থেকেই ভালো সম্পর্ক ছিল। তারা আফগানদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করত। ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে সোভিয়েত সৈন্যবাহিনী আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট সরকারকে রক্ষার নামে সেখানে ঢুকে পড়ে । বলে রাখা ভালো, তারা আফগানিস্তানে ছয় মাস থাকার কথা বলে এখানে প্রবেশ করেছিল। অথচ সেই ছয় মাস হয়ে গেল দীর্ঘ ১০ বৎসর। এখানে প্রসঙ্গক্রমে একটি বিষয়  তুলে ধরা প্রয়োজন। সেটি হলো ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ওপর সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্ট মতাদর্শ চাপিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু তারা কখনই তা গ্রহণ করেনি। যাইহোক, আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ভেতর দিয়েই জন্ম হয়েছিল আজকের তালেবান এবং আল-কায়েদার মত জিহাদী বাহিনী। সোভিয়েত কমান্ডোরা আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হাফিজুল্লাহ আমিনকে হত্যা করে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে স্নায়ু যুদ্ধ চলছিল তার বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল আফগানিস্তান। আফগানিস্তান হয়ে গেল মস্কো আর আমেরিকার প্রক্সি যুদ্ধ ক্ষেত্র। কিন্তু মস্কো যে উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য আফগানিস্তান আক্রমণ করেছিল তার ফলাফল ছিলো শূন্যের কোঠায়। প্রসঙ্গত সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯৮৫ সালে নতুন নেতা হিসেবে আবির্ভাব ঘটে মিখাইল গর্বাচেভের। তিনি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন এই যুদ্ধে তাদের জয় আসবে না।তাই এই যুদ্ধের ইতি টানা হয় ১৯৮৯ সালে। এই যুদ্ধে ১৫০০০ সোভিয়েত সেনা এবং ১০ লাখ আফগান মারা যায়। আজকে আমরা দেখছি, সোভিয়েত ইউনিয়েনের পরিণতি আমেরিকার ভাগ্যেও ঘটলো। আফগানিস্তানে মার্কিনিদের শোচনীয় অবস্থা আমাদের ভিয়েতনামে তাদের পরাজয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। ভিয়েতনামে তারা যুদ্ধ করে ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। রিচার্ড নিক্সন বৃহত্তম এই যুদ্ধের ইতি টেনেছিলো। সেখানেও তারা এক স্বার্থপরতার কাজ করে। তারা তাদের সাথে সম্পৃক্ত লোকদের অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে আসে। যার ফলাফল ছিল ভয়ঙ্কর। ১৯৭৩ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামে মিত্রদের মৃত্যু ঝুঁকির মধ্যে ফেলে চলে গিয়েছিলো মার্কিনিরা । এতে পরের বছর ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে দক্ষিণ ভিয়েতনামে ৮০ হাজার সেনা ও বেসামরিক লোক নিহত হয়। অন্যদিকে আফগানিস্তানে ওয়াশিংটনের সেনা মারা গেছে প্রায় ২৫০০ জন। আর খরচ হয়েছে দুই ট্রিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে ২০ বছরে গড়ে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ জন বেসামরিক মানুষকে জীবন দিতে  হয়েছে।  

যাইহোক মার্কিন সৈন্য পুরোপুরিভাবে প্রত্যাহার করার পর কাবুলের ভাগ্যে কি ঘটতে পারে, তা স্পষ্ট  হতে শুরু করেছে। এবার বলতে সংকোচ নেই আফগান সরকারের পতন সময়ের ব্যাপার । মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের দরুন আফগান সরকারের সৈন্য বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়েছে। এর বড় প্রমাণ হলো, উত্তরাঞ্চল থেকে অনেক সরকারি সৈন্য পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে তাজিকিস্তানে। এভাবে তালেবানরা বিভিন্ন অঞ্চল দ্রুত নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসছে। আফগানিস্তানের ৪২১টি জেলার প্রায় অর্ধেকে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে তারা।কান্দাহারের কাছাকাছি চলে এসেছে তালেবানরা। এই প্রদেশকে বলা হয় তালেবানের জন্মস্থান। তালেবানদের দুর্দান্ত সাফল্যের কারণ কী? বলতে গেলে কয়েকটি দেশ  সহায়তা করায় খুব সহজেই জয়ের পাল্লা ভারি হচ্ছে তাদের। এটা স্পষ্ট যে তালেবানদের প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করছে চীন, পাকিস্তান, ইরান ও রাশিয়া। কারণ মার্কিন মদদপুষ্ট সরকারের পতন ঘটলে তাদের জন্য বেশ সুবিধা হবে। চীন পাকিস্তানের সঙ্গে চলমান তার অর্থনৈতিক করিডোরে  আফগানিস্তানকে যুক্ত করতে খুবই উদগ্রীব। আবার  কোয়াডের (ভারত, যুক্তরাষ্ট, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের সম্মিলিত জোট) বিপরীতে চীন-পাকিস্তান মিয়ানমার আফগানিস্তানকে নিয়ে একটি জোট গঠন করারও উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছে বেইজিং। পাকিস্তানও তালেবানদের ক্ষমতায় দেখতে চায়। এতে তারা তালেবানের সঙ্গে নিয়ে বেলুচিস্তান থেকে কান্দাহার পর্যন্ত রেল যোগাযোগ বাড়াতে পারবে। বলতে দ্বিধা নেই, ভারতের প্রভাব কমাতেও তালেবানকে প্রয়োজন ইসলামাবাদের। এদিকে ঘরের কাছ থেকে আমেরিকা বিতাড়িত হওয়ায় ইরানও বেজায় খুশি। তবে ইরান মনে করে, কাবুল এমন একটি সরকার দরকার যারা সব জাতি-ধর্ম-বর্ণের প্রতিনিধিত্ব করবে। ইদানিং অবশ্য চীনের দিকে বেশি ঝুকঁছে তারা। কারণ তাদের পরবর্তী অর্থনীতির সুবিধা পেতে হলে চীনকেও খুব বেশি প্রয়োজন। তালেবানের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতও ভীষণ বেকায়দায় আছে। ইতিমধ্যে তারা তাদের কনস্যুলেট অফিস থেকে কর্মকর্তা সরিয়ে নিয়েছে। তালেবানের সাথে চীন ও পাকিস্তানের মাখামাখি খুব সহজে নিচ্ছে না নয়াদিল্লি। ফলে তারাও তালেবানের সাথে যোগাযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিশ্বাস, তালেবান সরকারে গেলে অত্র অঞ্চলের রাজনীতির মোড় ঘুরে যাবে। ফলে অচিরেই জটিল হয়ে উঠবে এ অঞ্চলের ভূরাজনীতি। 

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়