সুস্থভাবে বাঁচতে দরকার স্বাস্থ্য সচেতনতা

"স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল" আমরা সবাই এই কথাটির সাথে পরিচিত। এই পৃথিবীতে আমাদের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হল সুস্থভাবে বেঁচে থাকা। কিন্তু দেখা যায়, সারাদিনের কর্মব্যস্ততার ফলে আমরা স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতেই ভুলে যাই। এই অসচেতনতার জন্য আমরা নিজেদের ক্রমে ক্রমে ভয়াল রোগগুলোর (হৃদরোগ,উচ্চরক্তচাপ,কিডনী বিকল হওয়া,ক্যান্সার,লিভার সিরোসিস ইত্যাদি) দিকে ধাবিত করি। অথচ আমাদের প্রতিদিনের একটু স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রয়াস এই রোগগুলো থেকে মুক্তি মেলাতে পারে।

পৃথিবীতে আমরা যখন জন্মগ্রহণ করি তখন মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের পূর্ণ রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা দিয়েই এই পৃথিবীর আলো দেখান। কিন্তু বড় হওয়ার পাশাপাশি খুব ধীরে ধীরে আমার এই ক্ষমতা হারিয়ে ফেলার কারন হিসেবে রয়েছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কিছু আলসেমি,বেখায়ালিপনা আর কিছু বদ অভ্যাস।কথায় আছে - "দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বুঝে না" তেমনি আমরাও জীবনের শুরুর দিকে আমরা স্বাথ্যের যত্ন নেই না,কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে বিভিন্ন রোগের কবলে পড়ে স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হই,কিন্তু তখন আর শত চেষ্টার ফলেও সেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ফিরে পাই না।

অন্যদিকে পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র জাপান এর দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পাই উক্ত দেশের জীবন যাত্রার মান কতটা উন্নত। সারা বিশ্বের মধ্যে জাপানের গড় আয়ু সর্বাধিক। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর রিপোর্ট অনুযায়ী,জাপানের মানুষের গড় আয়ু ৮৪ বছর যেখানে বিশ্বের অন্য সকল মানুষের গড় আয়ু ৭২.৬ বছর।জাপানীদের এই গড় আয়ুর পেছনে যে রহস্য লুকিয়ে আছে তা হলো তাদের সঠিক জীবন যাত্রা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস। জাপানিরা তাদের প্রতিদিনের খাবারে নানান শাকসবজি,মাছ,সামুদ্রিক উদ্ভিদ,টাটকা ফলমূল ইত্যাদি খেয়ে থাকে এবং উচ্চমাত্রার তেল-চর্বি জাতীয় ,প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলে।এছাড়াও খাবারের সাথে তারা বিভিন্ন প্রাকৃতিক মসলাও গ্রহণ করে থাকে যা স্বাস্থ্যের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।জাপানীরা যে শুধু তাঁদের খাদ্যাভ্যাস নিয়েই যত্নশীল তা নয়,তাঁরা প্রতিদিন সাধ্যমত শারীরিক ব্যায়াম করে থাকে যা দেহকে আরো স্বতঃস্ফূর্ত রাখতে সহয়তা করে।আর এভাবেই জাপানের গড় আয়ু দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আমরা চাইলেই প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চলার মাধ্যমে জাপানিদের মতো সুস্থ  ও দীর্ঘ জীবন লাভ করতে পারি।স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে আমাদের সবার উচিত দৈনিক ব্যায়াম করা,প্রচুর পরিমাণে টাটকা শাকসবজি,ফলমূল,পরিমিত পানি,বাদাম দুধ ইত্যাদি খাওয়া।অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে চাংগা রাখে এমন সকল ধরনের খাবার গ্রহণ করা উচিত।
আমাদের খাদ্য তালিকায় কোন খাবারগুলি অবশ্যই রাখা উচিত এটা যেমন জানা প্রয়োজন,তার চেয়েও বেশি জানা প্রয়োজন কোন খাবারগুলি একেবারেই এড়িয়ে চলা উচিত। স্বাস্থ্যের পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ এই খাবারগুলির মধ্যে রয়েছে প্রক্রিয়াজাত পানীয় (যেমন-কোকাকোলা,সেভেন আপ ইত্যাদি),অতিরিক্ত মাত্রায় তেল,চর্বি জাতীয় খাবার,খাবারের সাথে অতিরিক্ত পরিমাণে লবণ এবং চিনি খাওয়া,রান্নায় অতিরিক্ত তেল,মসলার ব্যবহার,লাল মাংস,অতিরিক্ত পরিমানে বাজারের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাওয়া,নেশাজাতীয় দ্রব্য ইত্যাদি সবকিছুই আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।এইসকল খাদ্য গ্রহনের ফলেই মানুষ অল্প বয়ষ এই হৃদরোগ,উচ্চ রক্তচাপ,ক্যান্সার,লিভার সিরোসিস,ডায়াবেটিস,ফুসফুসের সমস্যা,হাড়ের রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে।

আমি মনে করি,খাদ্যাভ্যাস এর সচেতনতা সম্পর্কে শিশুদের শৈশব থেকেই গুরুত্ব এর সাথে জানানো দরকার। পাঠ্যপুস্তকে স্বাস্থ্যকর খাদ্যের তালিকা দেওয়ার পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর খাদ্যের কুফল তুলে ধরা উচিত।কেননা বাংলাদেশে দেখা যায় যে,অনেকে ৩৫/৪০ বছরে অথবা এর বেশি বছরে বিভিন্ন রোগের সম্মুখীন হয়ে স্বাস্থ্যসচেতনতার দিকে ঝুঁকে পড়ে।কিন্তু তখন আর নিজেকে পুরোপুরি সুস্থ করে তুলার মতো সময় আর থাকে না। সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের পাশাপাশি অনেক শিক্ষিত মানুষদেরকেও দেখা যায় স্বাস্থ্যের প্রতি অসচেতন।পৃথিবীতে শুধু শ্বাস-প্রশ্বাস এর মাধ্যমে বেঁচে থাকাকেই বেঁচে থাকা বলে না, সুস্থভাবে বেঁচে থাকাকেই প্রকৃতপক্ষে  বেঁচে থাকা বলা হয়।

তাই আমাদের সকলের উচিত খাদ্যাভ্যাসের দিকে এবং তার পাশাপাশি শারীরিক কসরতের  দিকে সজাগ দৃষ্টি দেওয়া এবং অন্যকেও উৎসাহিত করা যেন আমরা আমাদের রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলে পরিবার পরিজনের সাথে সুস্থ জীবন লাভ করে শান্তির বাতাবরণ বজায় রাখতে পারি।